যদি নসিব থাকে, আপনি আসবেন।
‘যদি থাকে নসিবে, আপনি আপনি আসিবে’- এটি একটি জনপ্রিয় গানের লাইন। শামসুল হক চিশতী (চিশতী বাউল) এই গানটি গেয়ে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছেন। তার সুর ও গায়কিতে গানটি শ্রোতাদের হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলেছে। নসিব বা ভাগ্য সম্পর্কে পবিত্র কোরআন ও হাদিসে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। সুরা হাদিদের ২২ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘পৃথিবী বা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের ওপর যে বিপদ আসে, তা আগে থেকেই লিখিত থাকে। আল্লাহর জন্য এটি খুবই সহজ।’
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সামাজিক অবস্থা বিশ্লেষণ করলে বলা যায়, ভাগ্য যা নির্ধারণ করেছে, তা মানুষ পরিবর্তন করতে পারে না। যে ব্যক্তি যা পায়, তা তার ভাগ্যেই লেখা থাকে। আল্লাহপ্রদত্ত মেধা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব। তবে, ভাগ্য না থাকলে পরিশ্রম করলেও পরিবর্তন সম্ভব নয়। যারা ভাগ্যে বিশ্বাস করেন না, তারা আলাদাভাবে মত প্রকাশ করলেও শেষ পর্যন্ত নিজেদের জীবনের পরিস্থিতি দেখে ভাগ্যকেই মেনে নিতে বাধ্য হন।
যদি শেখ হাসিনা আরো কিছু সময় ক্ষমতায় থাকতেন, তবে সম্ভবত ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে জেলে পাঠানো হতো। কিন্তু আজ তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান। আর যিনি তাকে জেলে পাঠানোর পরিকল্পনা করেছিলেন, তিনি এখন দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। যারা ছাত্ররা চাকরি কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন, তারা এখন মন্ত্রী হয়ে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন।
যে খালেদা জিয়াকে দিনরাত জেলে বন্দি রাখা হয়েছিল, তাকে বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি পর্যন্ত দেওয়া হয়নি, সেই খালেদা জিয়া এখন সুস্থ হয়ে পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করেছেন এবং বাংলাদেশের জনপ্রিয় নেতা হিসেবে পরিচিত। তারেক রহমান, যাকে সরকার দেশত্যাগে বাধ্য করেছিল, তিনি এখন সব মামলায় মুক্ত হয়ে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা।
খালেদা জিয়া দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে ক্যান্টনমেন্টের ঐতিহাসিক বাড়িতে বসবাস করেছেন, কিন্তু তাকে সেখানে অপমানিত করে বের করে দেওয়া হয়। সেই বাড়ি এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। শেখ হাসিনার প্রতিহিংসাপরায়ণ মনোভাবের বিপরীতে, প্রকৃতির প্রতিশোধে তার পিতার ধানমন্ডির বাড়ি জনতার রোষে পড়ে ধুলায় মিশে গেছে।
এখন যে আদালতে জামায়াত ও বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ উঠেছিল, সেখানে শেখ হাসিনার বিচার চলছে। যে আইনে জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়েছিল, সেই আইনে এখন আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হতে পারে। গত আট মাসে যা ঘটেছে, তা পুরোপুরি ভাগ্যের লেখন। মহান আল্লাহতায়ালা যা লিখেছেন, তা-ই বাস্তবে ঘটছে।
যারা কর্মে বিশ্বাসী, তাদের হিসাব অনুযায়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস আজ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান, আর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়েছেন। ভাগ্যে বা কর্মে বিশ্বাসী সবাইকে একটাই শিক্ষা—নিজের ভাগ্য বা নসিবে যা আছে, তা-ই পাবেন। ষড়যন্ত্র করে কিছুই পরিবর্তন করা যাবে না।
এ বছর দেশের মানুষ শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ঈদ উদযাপন করেছেন। গুম-খুনের আতঙ্ক নেই, জনগণ নিরাপদে ছুটিতে যেতে পেরেছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতীয় ঈদগাহে ঈদের নামাজ পড়েছেন এবং বলেন, ‘নতুন বাংলাদেশ গড়তে যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের জন্য দোয়া করি। জাতীয় ঐক্য গড়ে নতুন বাংলাদেশ গড়তে হবে।’ তার এই বক্তব্য জাতিকে নতুন দিকনির্দেশনা দিয়েছে।
এখন দেশের ভিতরে কিছু আগাছা ও ধান্দাবাজরা রয়েছে, যারা জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় বাধা সৃষ্টি করছে। সরকারের দুর্বলতার কারণে সামাজিক মাধ্যমে নানা উপদেশ শোনা যাচ্ছে। তবে নতুন বাংলাদেশ গড়তে স্থায়ী ঐক্য এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অত্যন্ত জরুরি। নির্বাচনের বিলম্বের ফলে এই উদ্যোগ সফল না হলে তা জাতির জন্য বড় ক্ষতি হবে।
মেশকাত শরিফে আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘একজন ব্যক্তি তার সঙ্গীসাথি দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাই কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব করার আগে তার বিশ্বাস ও জীবনাচার জানো।’ বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ছাত্র-জনতার মনোনীত। তবে তাদের কাজের মধ্যে অনেক সময় সমন্বয়হীনতা দেখা গেছে, এবং কিছু ধান্দাবাজ ব্যক্তি সরকারের ভিতরে ঢুকে পড়েছে। তাদের উদ্দেশ্য হল, দেশে স্থায়ী ঐক্য প্রতিষ্ঠিত না হওয়া।
সুতরাং, দেশের ভবিষ্যত নির্ভর করছে ঐক্য ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ওপর। স্থায়ী জাতীয় ঐক্য ছাড়া নতুন বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়। এবং যদি এই বিপ্লব ব্যর্থ হয়, তাহলে জনরোষ সৃষ্টি হতে পারে, যা আরও একটি বিপ্লবের জন্ম দিতে পারে।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রকাশিত: | By Symul Kabir Pranta