ট্রাম্পের শুল্ক বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার পোশাক শিল্পে বড় বিপর্যয়: নিউইয়র্ক টাইমস
কোভিড মহামারির পর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা তাদের পোশাকশিল্পে বড় কোনো পতন ঘটতে দেয়নি। এই শিল্পের ওপর ভিত্তি করে তারা নিজেদের উন্নতির আশা বাঁচিয়ে রেখেছিল। উভয় দেশের প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে নতুন শুল্ক আরোপের ফলে বড় ধাক্কা লাগতে চলেছে।
বুধবার (২ এপ্রিল) ট্রাম্পের শুল্কের ঘোষণায় বাংলাদেশকে ৩৭ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে, আর শ্রীলঙ্কার শুল্ক হবে ৪৪ শতাংশ। এতে দুই দেশের ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। তারা আশঙ্কা করছেন, তারা হয়তো বৃহত্তর উৎপাদক শক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারবেন না এবং তাদের অর্ডারগুলো কম শুল্কযুক্ত দেশগুলোতে চলে যাবে।
শ্রীলঙ্কার জয়েন্ট অ্যাপারেল অ্যাসোসিয়েশন ফোরামের পরামর্শক তুলি কুরে বলেন, ‘৪৪ শতাংশ শুল্ক কোনো হাস্যকর বিষয় নয়।’ বাংলাদেশেও একই অবস্থা। অর্থনীতিবিদরা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এর ফলে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে এবং নতুন করে অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়বে।
তবে বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস জানিয়েছেন, তারা শুল্ক কমানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করবেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বিষয়টি পর্যালোচনা করছি এবং আলোচনা মাধ্যমে এটি সমাধান করতে সক্ষম হব।’
শুধু বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা নয়; ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক বৃদ্ধি বিশ্বব্যাপী পোশাক শিল্পের প্রধান দেশগুলোকেও চিন্তায় ফেলেছে। উইলিয়াম ব্লেয়ার গবেষণা সংস্থা জানিয়েছে, যে দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানির প্রায় ৮৫ শতাংশ উৎপাদন করে, সেগুলোর ওপর গড়ে ৩২ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, এসব দেশের উপর শুল্ক আরোপের ফলে শুধুমাত্র তাদের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর ওপরও চাপ সৃষ্টি হবে। উইলিয়াম ব্লেয়ারের মতে, এতে পণ্যের খরচ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে, যার পরিণামে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের জন্য সমস্যা হতে পারে।
বাংলাদেশ প্রতিবছর ৭০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে। মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে পোশাক শিল্প থেকে, যা প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। এ খাতে অধিকাংশ কর্মীই নারী, যারা দেশের দারিদ্র্য দূরীকরণের একটি বড় অংশ।
গত বছরের বিক্ষোভের পর বাংলাদেশের স্বৈরশাসকের পতন হয় এবং দেশটি অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে, যেখানে পোশাক শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘বিশ্ব অর্থনীতি যখন পুনরুদ্ধারের দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই ট্রাম্পের শুল্ক আরোপ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের অনেক পোশাক কারখানা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের জন্য কাজ করে। কিছু কারখানা পুরো পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে, এসব কারখানাগুলো বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে।’
শ্রীলঙ্কায় পোশাক শিল্পে সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষ কর্মরত, যারা নাইকি ও ভিক্টোরিয়া’স সিক্রেটের মতো ব্র্যান্ডের পোশাক তৈরি করে। দেশটির রপ্তানি আয়ের প্রায় অর্ধেক আসে এই খাত থেকে, যার বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়।
২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি ধসে পড়েছিল, কিন্তু আইএমএফ প্রণোদনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে তা পুনরুদ্ধার হয়েছে।
শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিষয়ক উপমন্ত্রী অনিল জয়ন্ত ফার্নান্দো বলেন, ‘আমরা শুল্ক আরোপের আগে আলোচনা করে এটি কমানোর চেষ্টা করব, বিশেষ করে আমাদের বর্তমান কঠিন পরিস্থিতি বিবেচনায়।’
তথ্যসূত্র- নিউইয়র্ক টাইমস।
প্রকাশিত: | By Symul Kabir Pranta